যদি প্রশ্ন করা হয় বাংলাদেশ থেকে রফতানি হওয়া সবচেয়ে মূল্যবান পণ্য কি?
পণ্যটি হচ্ছে আগর। লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা অন্যতম এক শিল্পখাত আগর। আগর থেকে উৎপাদিত প্রতি তোলা আতরের দাম ৬ হাজার টাকার বেশি। বিদেশের বাজারে এই একই আগর বিক্রি হয় মান ভেদে ৫ থেকে ৩০ হাজার ডলারে। এ কারণে আগরকে বাংলাদেশের ‘তরল সোনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আগর কাঠ থেকে তৈরি হয় আতর, আগরবাতি। মধ্যপ্রাচ্যে আগরের কদর অনেক। প্রতিবছর কয়েকশো কোটি টাকার আগরের পণ্য রফতানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য সহ সারা দেশে। শুধুমাত্র মৌলভীবাজার জেলায় ৩০০ টির বেশি কারখানা গড়ে উঠেছে। সেখানে আগর উৎপাদন ঘিরে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রষ্ঠপোষকতা পেলে দেশের ৫ হাজার কোটি টাকার আগর ব্যবসা ১০ হাজার কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
আন্তর্জাতিক বাজারে আগরের মূল্য সম্পর্কে ধারণা নেয়া যাক: ভালো মানের আগর কাঠের মূল্য প্রতি কেজি প্রায় ৭.৭৫ লক্ষ টাকারও বেশি হয়ে থাকে। চাষ হওয়া গাছের প্রতি কেজি আগর কাঠের মূল্য ৫০০০ ডলার বা প্রায় ৩.৮৭ লক্ষ টাকা। এভারেজ মামের আগর তেলের প্রতি কেজির মূল্য ৮০০০ ডলার বা প্রায় ৬.২০ লক্ষ টাকা। আশ্চর্যজনক তথ্য হলো উচ্চ মানের আগর তেল ৫০,০০০ ডলার বা প্রায় ৩৮.৭৫ লক্ষ টাকার বেশি মূল্যে বিক্রি হয়। আগরের প্রধান আমদানীকারক দেশ হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপান, সৌদি আরব ও তাইওয়ান। প্রধান রপ্তানিকারক দেশ হলো, সিংগাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দেনেশিয়াও থাইল্যান্ড। প্রতিবছর সিংগাপুর থেকে ১.২ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৯,৩০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের আগর জাত সামগ্রী রপ্তানি করা হয়।
সিলেটের কিছু অঞ্চলে আগর চাষ করা হয়। ছোট বড় বাগানের পাশাপাশি বসতবাটির আঙ্গিনায় পর্যন্ত আগর চাষ করা হচ্ছে। এখানকার আগর চাষের ইতিহাস প্রায় ৪০০ বছরের পূরাতন। বন বিভাগর মাধ্যমে দেশের কিছু এলাকায় আগর বাগান করা করা করা হয়েছে। তাছাড়া চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ব্রাক এর নিজস্ব বাগানে ২০০৭ সাল থেকে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বল্প সময়ের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে আগর কাঠ সংগ্রহের লক্ষ্যে আগর প্লান্টেশন এর একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানা যায়।
এদেশে আগরের সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা গুলো কি?
আগর উৎপাদনকে প্রধানমন্ত্রী শিল্প হিসেবে ঘোষণা করেছেন। বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে আগর চাষের জন্য উপযোগী ভূমি রয়েছে এবং বর্তমানে সেখানে আগরের আবাদ হচ্ছে।
উৎপাদিত আগরের মান নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মান সম্পন্ন আগর উৎপাদন করতে না পারলে বিদেশে ভাল দাম পাওয়া যাবে না। তাই উৎপাদিত আগরের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য একাধিক ল্যাবরেটরি স্থাপন করতে হবে। ইতোমধ্যে মৌলভীবাজারে ল্যাবরেটরি স্থাপন হচ্ছে। সনাতন পদ্ধতির বদলে আগর তেলসহ অন্যান্য আগরজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব হলে আগর শিল্পে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করতে পারে।
আগর চাষ বিষয়ে আমাদের আধুনিক কারিগরী জ্ঞানের অভাব রয়েছে। সনাতন চাষ পদ্ধতির কারণে পণ্যের মানও কম। আগর শিল্পে আমাদের সবচেয়ে সমস্যা অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য ও উচ্চ রপ্তানি শুল্ক। বৈধ উপায়ে নানা হয়রানির শিকার হওয়ায় ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আতর রফতানি করছেন। কেউ যাত্রীদের মাধ্যমেও বিদেশ পাঠাচ্ছেন। যার ফলে কিছু আঞ্চলিক রফতানি ব্যুরোর কাছে নেই রফতানির সঠিক হিসাব। তাছাড়া আগর শিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার ভিষণ অভাব লক্ষনীয়। এছাড়া রয়েছে আইনি জটিলতা, বন বিভাগ ও আগর চাষীদের রেসারেসি। আগর শিল্প একটি জ্বালানি প্রধান শিল্প হওয়ায় গ্যাস সঙ্কটের কারণে আগর উৎপাদনে সমস্যা হচ্ছে।
সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে এগিতে নিতে হলে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির ব্যবহারের বিকল্প নেই। এ বিষয়ে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ভারত প্রভৃতি দেশের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। তাছাড়া যারা বংশ পরম্পরায় আগর চাষের সাথে জড়িত, তাদের উন্নত প্রযুক্তি ও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় এনে এ শিল্পকে দ্রূত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। সরকারি পলিসি সাপোর্ট পাওয়া গেলে এ খাতে বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাবে। ফলে আগর শিল্প বাংলাদেশে একটি অন্যতম বৈদেশিক মূদ্রা অর্জনকারী খাত হিসেবে স্থান করে নিবে।
#Himel_Rahman
#DefRes

No comments:
Post a Comment